দীপক দাস

মাঝে মাঝে বিস্মরণ ঘটে। সময়ের চাপে। আর সেটা কাকতালীয় ভাবে ঘটেছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি। দু’বার তাঁর জন্মস্থানের কাছ দিয়ে গিয়েছি। অথচ একবারও তীর্থস্থান দর্শন করিনি আমরা। শেষপর্যন্ত অবশ্য তীর্থ দর্শন হয়েছিল। এক শীতের সন্ধ্যায়।
‘সে দিনটা আমার খুব মনে পড়ে’। না, মেজদার তত্ত্বাবধানে কঠোর অধ্যবসায়ের সঙ্গে পড়াশোনার দিনটা নয়। কথাশিল্পীর জন্মস্থান হুগলির দেবানন্দপুরে যাওয়ার দিনটা। ব্যান্ডেল থেকে বেশি দূরে নয়। কিলোমিটার তিনেক হবে। দেবানন্দপুরের কাছাকাছি আমরা আগে দু’বার এসেছি। একবার রাজহাটে ময়ূর দেখতে। আরেকবার এখানকার আমবাগানে বনভোজন করতে। তৃতীয়বার এসেছি ময়ূরের খাবার জন্য গম, চাল দিতে (কেকার কথা শুনুন, খেতে দিন)। প্রথম দু’বার ফেরার পথে মনখারাপ হয়েছে। শরৎচন্দ্রের জন্মভিটে না দেখে ফিরে যাচ্ছি!
তৃতীয়বারের সঙ্গী ছিল ইন্দ্র। ওকে বললাম, যত দেরিই হোক, আজ দেবানন্দপুরে যাবই। রাজহাটে ময়ূরের খাবার পৌঁছে দিয়ে বেরোতে বেরোতে বেশ দেরিই হয়ে গিয়েছিল সেদিন। তবুও আমরা গিয়েছিলাম। ভরা জানুয়ারি। শীতের বেলার মেয়াদ অটোয় যেতে যেতেই শেষ। যখন পৌঁছলাম, তখন গাছগাছালিতে ঘেরা শরৎচন্দ্রের দেবানন্দপুরে বিজলি বাতি জ্বলে উঠেছে। প্রথমে গিয়েছিলাম শরৎচন্দ্রের পৈতৃক ভিটেয়। বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ হয়। পুরনো দিনের বাড়ির মতোই রং আর আদল রক্ষিত। ঢুকতেই সামনে শরৎচন্দ্রের একটি আপাদমস্তক মূর্তি। হাতে বই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ‘শ্রীকান্ত’, ‘পথের দাবী’, ‘দত্তা’, ‘বিরাজবউ’, ‘দেবদাস’এর জনক। সে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ। যে রোমাঞ্চ হয়েছিল দেউলটিতে শরৎচন্দ্রের সামতাবেড়ের বাড়ির সামনে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে। ঘাটে লেখা ছিল, এই পুকুরেই ছিল রামের পোষা কাতলা মাছ কার্তিক, গণেশ। ‘রামের সুমতি’র রাম।

তবে দেবানন্দপুরের রোমাঞ্চের আরও বাকি ছিল। ওখানকার লোকজনই সন্ধান দিয়েছিলেন শরৎ স্মৃতি মন্দিরের। এটি একটি গ্রন্থাগার এবং সংগ্রহশালা। স্মৃতি মন্দিরের সামনে শরৎচন্দ্রের একটি মূর্তি স্থাপিত। ফলকে দেখলাম, মূর্তিটি উদ্বোধন করেছিলেন স্বনামধন্য কবি রাধারানী দেবী। সংগ্রহশালায় ঢুকতে গেলেই প্রথম ধাক্কা, ছবি তোলা নিষেধ। কিন্তু ছবি না তুললে এত তথ্য কি নোট করা সম্ভব? পাশেই গ্রন্থাগার। সেখানে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক বসে। তাঁর দ্বারস্থ হওয়া গেল। আমাদের সমস্যার কথা বললাম। তিনিও বললেন, ছবি তোলা নিষেধ। তার পর যা করেছিলাম তা আইনবিরুদ্ধ কাজ। ছবি দেখতে দেখতেই আমরা কিছু নথি ডিজিটাইজেশন করে নিয়েছিল।
সংগ্রহশালায় ঘুরতে ঘুরতেই একটা তথ্য আবিষ্কার করলাম। দেবানন্দপুর শুধু শরৎচন্দ্রের স্মৃতি বিজড়িত নয়। এই গ্রামে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়েরও স্মৃতি রয়েছে। ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের রচয়িতা কাব্য প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে দেবানন্দপুরেই। তথ্যটি খোলসা করা যাক। ভারতচন্দ্রের বাড়ি হাওড়া জেলার পেঁড়ো (পাণ্ডুয়া) গ্রামে। সে গ্রাম আমাদের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূর নয়। আমরা ঘুরেও এসেছি ‘মধ্যযুগের শেষ কবি’র জন্মস্থানে (পাণ্ডুয়ার মণিমালা)। তাহলে দেবানন্দপুরের সঙ্গে তাঁর যোগ কোথায়?

সেই যোগ আবিষ্কার করতে হলে দেবানন্দপুরের ইতিহাস উল্লেখ প্রয়োজন। এই ইতিহাসের সঙ্গে সপ্তগ্রামের যোগ রয়েছে। সপ্তগ্রাম এক সময়ে সমৃদ্ধ নগরী ছিল। প্রাচীন বাংলার রাজধানীও ছিল ব্যবসা বাণিজ্যে উন্নত এই নগরী। যে সাতটি গ্রাম নিয়ে সপ্তগ্রাম গঠিত সেগুলোর একটি হল দেবানন্দপুর। সরস্বতী নদীর তীরে এর অবস্থান। আর সরস্বতী নদী তখন বাণিজ্যের অন্যতম পথ। এই গ্রামের জমিদারেরা অনেকেই ফারসি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। তাঁরা সপ্তগ্রামের নবাব ও দিল্লির বাদশাহের উচ্চপদস্থ কর্মী ছিলেন। সে জন্য তাঁরা মুন্সি উপাধি পেয়েছিলেন।
কিশোর ভারতচন্দ্র দেবানন্দপুরে এসেছিলেন ফারসি ভাষা শিক্ষার জন্য। সেই সময়ে ফারসি ভাষার দাম ছিল। কাজকর্ম পেতে সুবিধা হত। ভারতচন্দ্র থাকতেন জমিদার রামচন্দ্র মুন্সির আশ্রয়ে। ফারসি শেখার জন্য পাঁচ বছর দেবানন্দপুরে ছিলেন তিনি। একবার রামচন্দ্রের বাড়ি সত্যনারায়ণের পুজো হচ্ছিল। পুজোয় ভারতচন্দ্র তাঁর লেখা ‘সত্যপীরের কথা’ শুনিয়েছিলেন। সেই তাঁর প্রথম কবিত্বের প্রকাশ। ভারতচন্দ্রের দেবানন্দপুরে অবস্থানের দেড়শো বছর পরে শরৎচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। তখন অবশ্য সরস্বতী নদীর সেই সুখের দিন আর নেই।

সংগ্রহশালায় শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র রয়েছে। আর রয়েছে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর ছবি-সহ বর্ণনা। শরৎ-সাহিত্যে এই এলাকার কোন কোন স্থানের উল্লেখ রয়েছে তার একটি তালিকা দেওয়া আছে শরৎ স্মৃতি মন্দিরে। সময় করে একদিন বেরিয়ে গড়ের জঙ্গল, প্যারি পণ্ডিতের পাঠশালা ইত্যাদি ঘুরে নেওয়া যেতে পারে। সংগ্রহশালা থেকে লেখকের জীবন ও সাহিত্যে উল্লেখ করা স্থানগুলো তালিকা করে করা যেতে পারে শরৎ-সফর।
ছবি— ইন্দ্রজিৎ সাউ
(সমাপ্ত)